পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত

সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে, তোমার কপালে ছোয়াবো গো ভাবি মনে মনে……।
সাগর নিয়ে  এটি একটি জনপ্রিয় গানের প্রথম অংশ।  সাগর নিয়ে মানুষের মনে জল্পনার কল্পনার যেন শেষ নেই। সাগরের বিশালতা, সৌন্দর্য্য মানুষকে সব সময় টেনেছে আর হয়েছে আকর্ষনের কেন্দ্র বিন্দু। বাংলাদেশে সমুদ্র সৈকত বলতে মানুষজন বঙ্গোপসাগরকেই বোঝে। এর বাইরেও বাংলাদেশেই রয়েছে কয়েকটি সমুদ্র সৈকত। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত তার মাঝে অন্যতম। আর চট্টগ্রাম শহরে ঘুরতে গিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত না দেখলে পুরো ভ্রমনটাই যেন বৃথা।

ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়া কর্ণফুলী নদী, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। এ নদীর মোহনায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর ‘চট্টগ্রাম বন্দর’। উৎস হতে এ নদীর দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার হলেও কাপ্তাই বাঁধ থেকে মোহনা পর্যন্ত সাড়ে ৮৮ কিলোমিটার।
উৎসব, পার্বণ কিংবা ছুটির দিন ছাড়াও চট্টগ্রামে ঘুরতে এলে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার আগ্রহ দেখান না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। পতেঙ্গা চট্টগ্রাম শহরের ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত একটি সমূদ্র সৈকত। এটি কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। পতেঙ্গা চট্টগ্রাম শহরের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। পতেঙ্গা যাওয়ার পথে অনেক বড় বড় কারখানা চোখে পড়বে। চোখে পড়বে মেরিন একাডেমি। যাওয়ার পথের অনেকটা জুড়েই পাশে থাকবে কর্ণফুলি নদী। নান্দনিক প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা বন্দর নগরী চট্টগ্রাম।দুইপাশে পাহাড়, একপাশে নদী, অন্যপাশে সাগর। কর্ণফুলীর মোহনা, পৃথিবীর সুন্দরতম এক নদীর মোহনা।

অস্তমিত সূর্যকে দেখতে দেখতে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে কার না ভাল লাগে। চট্টগ্রাম শহরের পতেঙ্গা সৈকতে আসলে পাবেন এ সুযোগ।পতেঙ্গা সৈকতটি অন্যান্য সৈকতগুলো থেকে আলাদা। একই সাথে এখানে পাওয়া প্রকৃতির নৈসর্গিক হাতছানি আর তার সাথে সমুদ্র বন্দরের কর্মব্যস্ততা। বিশাল সমুদ্রের সাথে কর্ণফুলী নদীটির মিলনমেলা এখানে। কিছু এলাকা জুড়ে চতুরকোণ কণক্রিটের আবরণ দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
ভ্রমণপিপাসুরা শুনতে পাবেন সাগরের কল্লোল, দেখবেন নীল জলরাশির অপার ঢেউ। বিশ্বের নানাদেশের নানা পতাকাবাহী নোঙর করা সারি সারি জাহাজ, নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি করে। পর্যটক যিনিই আসেন, অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। পৃথিবীতে এরকম সৌন্দর্যে ভরপুর দ্বিতীয় কোন নদীর মোহনা সত্যিই বিরল। দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের সফেদ জলরাশি আর সাগরপাড়ে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মাতম আনমনা করে তোলে এখানে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের।
বাঁধ পেরিয়ে সমুদ্রের বালুকা বেলায় ডেকোরেশনের টেবিল ও চেয়ার পেতে খাবার হোটেল, শামুক-ঝিনুকের সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছে প্রায় ৪৩৬ টি দোকান। ছুটির দিনগুলোতে প্রচন্ড ভিড়ে মানুষেরা ঘুরে বেরিয়ে, কেনাকাটা করে সময় কাটাতে দেখা যায় বিশেষ করে এ পর্যটন মৌসুমে। বিকেলে সমুদ্র সৈকতের সুর্যাস্ত দেখার জন্য আসা নারী-পুরুষ,তরুন-তরুনী, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সকল বয়সের মানুষ আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরে যায়।
সন্ধ্যার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাড়ে কাফকো ও ইউরিয়া সার কারখানা লাল নীল বাতি দেখতে প্রাইভেট কার, মাইক্রো নিয়ে ছুটে আসে হাজার হাজার মানুষ। মানুষের মিলন মেলা বসে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত। সন্ধ্যায় নেভালের রাস্তার বিপরীত পাশে দোকান গুলো ছোট ছোট পেয়াজু ও কাকড়া ভাঁজি খেতে খেতে সন্ধ্যার পরিবেশটা উপভোগ, যে একবার করবে তাকে আরেক বার আসতেই হবে। রাতে জাহাজ বা নৌকায় নদীর মাঝে বা সমুদ্রের মাঝে গিয়ে চাঁদে আলোর পরিবেশটা কখনোই ভুলে যাবার মত নয়। হালকা মৃদু বাতাস , আর চার দিকে সবই সাদা। এই সাদা চাঁদের আলোটা যেন শুধুই নিজের জন্য।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণীঝড়ে এই সৈকতটি ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বর্তমানে সমূদ্র সৈকতে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা বেড়ি বাঁধ দেয়া হয়েছে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ঘাটি বিএনএস ঈসা খান পতেঙ্গার সন্নিকটে অবস্থিত। পতেঙ্গা সৈকতে যাওয়ার পথে নৌবাহিনীর গল্ফ ক্লাব পর্যটকদের মন কাড়ে খুব সহজেই। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর এর অনেক জেটি এইখানে অবস্থিত।
এটি চট্টগ্রাম শহরের আরেকটি প্রাণকেন্দ্র,পর্যটকদের মিলনমেলা। ইতোমধ্যে এই সৈকত বিশ্ব পরিচিতি পেয়েছে। বিকাল হতে না হতেই হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমায় এই সমুদ্র সৈকতে। মনোমুগ্ধকর এক পর্যটন এলাকা আর মনোরম পরিবেশ এর কারণে যে কেউ বার ছুটে আসতে চায় এই সৈকতে। কর্ণফুলী নদীর মোহনা সংলগ্ন নেভাল একাডেমীর সম্মুখে বিকাল হতে না হতেই শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। পরিবেশটা এতোটাই মনোমুগ্ধকর যে, কারো মনে যদি কোন দুশ্চিন্তা থাকে এবং সে যদি এই নেভাল একাডেমী কিংবা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ধারে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে তাহলে দুশ্চিন্তাগুলো মন থেকে কোথায় যেন হারিয়ে যায় নিমিষেই।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের অপরূপ দৃশ্য,পতেঙ্গাসমুদ্র সৈকত হতে সূর্যাস্ত দেখা এ সব কিছু মিলে যেন এক অসাধারণ অনুভুতি। এমন অপূর্ব মনকাড়া সৌন্দর্য্য কার না দেখতে ভাল লাগে বলুন।তাহলে আর দেরী কেন,যারা এখনো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে আসেননি,দেখেননি তারা এখনই চলে আসুন এই সৈকতে আর দেখে যান চাঁদের আলোয় চোখ জুড়ানো অপরূপ সৌন্দর্য্য।
কিভাবে যাবেন :
চট্টগ্রাম থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিনে। চট্টগ্রাম শহর থেকে অটো রিক্সায় করে যেতে সময় লাগে ঘণ্টা খানিক । ভাড়া নিবে ২৫০ টাকার মত । আর বাসে যেতে চাইলে তো কথাই নাই,বহদ্দার হাট, লালখান বাজার মোড়, জিইসি মোড় , নিউ মার্কেট , চক বাজার মোড় থেকে সরাসরি বাস পাবেন। বাসের গায়ে লেখা দেখবেন ” সী বীচ” লেখা আছে।
সতর্কতা
সৈকতে ঘুরতে গিয়ে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়াতে দল বেধে যাওয়াই ভালো। কোনো বিপদ কিংবা অভিযোগ থাকলে সৈকতের ভ্রাম্যমাণ পুলিশ ফাঁড়িতে জানাতে পারেন। তবে অধিক লোকের সমাগম আছে ওই দিকটায় থাকাই শ্রেয়। সৈকতে বেড়াতে গেলে নিজস্ব ক্যামেরা নিয়ে যেতে পারেন। কেননা একাকী ভ্রমণে গেলে সৈকতে থাকা ভ্রাম্যমাণ ফটোওয়ালাদের কাছে ছবি তুলতে না যাওয়াই ভালো।স্পিডবোড, নৌকা, ঘোড়া যেখানেই চড়ুন! আগে দেখে শুনে ভাড়া শুনে নিলে ভালো হয়।

Share this

Related Posts

Latest
Previous
Next Post »